Google search engine
HomePoliticsসিফাতের উত্থাপিত অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিলের হিসাব এবং পরবর্তী তদন্তের ফল—সবগুলো তথ্য...

সিফাতের উত্থাপিত অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিলের হিসাব এবং পরবর্তী তদন্তের ফল—সবগুলো তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলেই বিষয়টি যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব

বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি ভিডিওর পর গাজীপুরের কলেজছাত্র সিফাত আব্দুল্লাহর গ্রেপ্তারকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে পুরো ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে গ্রেপ্তারের সময় প্রচারিত অভিযোগ এবং পরবর্তী বিদ্যুৎ বিভাগের তদন্তের তথ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়।

ঘটনার শুরু সিফাত আব্দুল্লাহর একটি ফেসবুক ভিডিওকে কেন্দ্র করে। প্রায় ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে তিনি তার বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ করেন। তার দাবি ছিল, এক মাসে প্রায় ৪ হাজার এবং আগের মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। ভিডিওটির শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি অশালীন ও কটূক্তিপূর্ণ বক্তব্য দেন।

এরপর ৩ সেপ্টেম্বর গাজীপুর মহানগরের গাছা এলাকা থেকে সিফাতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পরপরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনের বড় একটি অংশে তার প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির বিষয়টি শিরোনামে গুরুত্ব পায়। কিছু প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার অভিযোগটিও শিরোনাম বা প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে উঠে আসে।

এ পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—সিফাতের দেখানো বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগটি বাস্তবে কতটা সঠিক? কারণ অভিযোগের মূল ভিত্তি ছিল তার বাসায় অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ বিল আসা। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক সংবাদ পরিবেশনের সময় এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা বিলের বিস্তারিত হিসাব সব ক্ষেত্রে সামনে আসেনি।

পরবর্তীতে ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর বোর্ড বাজার জোনাল অফিস থেকে সিফাতের বাসার বিদ্যুৎ বিল নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। আর সেখানেই সামনে আসে ভিন্ন চিত্র।

তদন্ত অনুযায়ী, সিফাতদের দোতলা বাড়িতে মোট তিনটি আবাসিক মিটার রয়েছে। মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে প্রথম মিটারে ৩২০ ইউনিট ব্যবহারের বিপরীতে বিল আসে ২ হাজার ৩৫৪ টাকা। দ্বিতীয় মিটারে ১ হাজার ১৩৫ ইউনিট ব্যবহারে বিল আসে ৯ হাজার ৩৮৭ টাকা এবং তৃতীয় মিটারে ৬২৫ ইউনিট ব্যবহারে বিল আসে ৪ হাজার ৫৩২ টাকা।

অর্থাৎ, চার মাসে তিনটি মিটারে মোট ২ হাজার ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে মোট বিল আসে ১৬ হাজার ২৭৩ টাকা।

বিলের মাসভিত্তিক হিসাবও সিফাতের ভিডিওতে উপস্থাপিত তথ্যের সঙ্গে ভিন্ন চিত্র দেখায়। তিনটি মিটার মিলিয়ে জুলাই মাসে মোট বিল ছিল ৬ হাজার ৪০৯ টাকা। পরের মাস আগস্টে সেই বিল কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৭২ টাকায়। অর্থাৎ তিনটি মিটার বিবেচনায় জুলাইয়ে গড় বিল ছিল প্রায় ২ হাজার ১৩৬ টাকা এবং আগস্টে প্রায় ১ হাজার ৪২৪ টাকা।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা সিফাতের বাড়িতে গিয়ে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের তালিকা সংগ্রহ করতে চাইলে পরিবারের পক্ষ থেকে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।

এই তথ্যগুলো সামনে আসার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও আগের তুলনায় ভিন্ন ধরনের ফ্রেমিং দেখা যায়। যেখানে গ্রেপ্তারের পরের সংবাদগুলোতে সিফাতের প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিল, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রকাশিত সংবাদগুলোতে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে তার অভিযোগের সত্যতা ও তদন্তের ফলাফল গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সিফাত তার ভিডিওতে দুই মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার কথা বললেও তিনি তিনটি আলাদা মিটারের কোনটির বিপরীতে কত টাকা বিল পরিশোধ করেছেন, তা স্পষ্ট করেননি। ফলে শুধু তার বক্তব্যের ভিত্তিতে মোট বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ নির্ধারণ করলে পুরো হিসাবটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এখানে ঘটনাটির আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সেটি সংবাদে উঠে এলে অভিযোগটি সত্য কি না—তা যাচাই করা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্বের অংশ। বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিলের মতো নির্দিষ্ট নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাইযোগ্য অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার বক্তব্য এবং বিলের পূর্ণাঙ্গ হিসাব শুরুতেই যুক্ত হলে পাঠক পুরো ঘটনাটি আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারতেন।

সিফাতের গ্রেপ্তার, তার দেওয়া অভিযোগ এবং পরবর্তী তদন্ত—তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখলেই ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়। গ্রেপ্তারের কারণ ছিল তার ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের বিরুদ্ধে অশালীন বক্তব্যের অভিযোগ; আর বিদ্যুৎ বিল নিয়ে তার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি পরবর্তীতে বিদ্যুৎ বিভাগের তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসে।

তাই পুরো ঘটনাকে শুধু ‘অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগে গ্রেপ্তার’ কিংবা শুধু ‘প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার’—এই দুইয়ের যেকোনো একটি সরল ফ্রেমে দেখলে ঘটনাটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ পড়ে যায়। বরং গ্রেপ্তারের কারণ, সিফাতের উত্থাপিত অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিলের হিসাব এবং পরবর্তী তদন্তের ফল—সবগুলো তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলেই বিষয়টি যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular