সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু স্ক্রিনশট ও ছবি প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে—হিন্দু পরিবারের ছাগল মুসলিমদের ফসল খেয়ে ফেলায় হিন্দু বাড়িঘর ভেঙে লুটপাট করা হয়েছে। ক্যাপশনে বলা হচ্ছে, ‘এটাই আমার বাংলাদেশ… কুমিল্লার একটি সাধারণ দিন—যেখানে ইউনুস মোস্তাফিজুরের নেতৃত্বে একদল লোক শুভাশিস দাসের পরিবারের ওপর হামলা চালিয়েছে। কারণ? দাসের একটি ছাগল ইউনুসের বাগানের কয়েকটি গাছ খেয়ে ফেলেছিল। হামলায় দাসের পেটে ছুরিকাঘাত করা হয়, তাঁর বড় ছেলের হাত কেটে ফেলা হয় এবং তাঁর স্ত্রীকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এলাকার কয়েকজন মানুষ যখন হামলাকারীদের শান্ত করতে এগিয়ে আসেন, তখন তাঁদেরও মারধরের শিকার হতে হয়। প্রসঙ্গত, এই ঘটনার পর থেকে দাসের ১২ বছর বয়সী মেয়ে নিখোঁজ রয়েছে।’ এ ধরনের দাবি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও ভীতি সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট সংবেদনশীল।
তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রচারিত দৃশ্যগুলোর সঙ্গে ছাগল ফসল খাওয়ায় হিন্দু বাড়িতে মুসলিমদের হামলা বা লুটপাটের কোনো ঘটনার সম্পর্ক নেই। দৃশ্যগুলো আসলে ময়মনসিংহে মাদক ব্যবসার অভিযোগে এক ব্যক্তির বাড়ি ভাঙচুরের। গত ২৮ আগস্ট ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর নিলক্ষীয়া ইউনিয়নের পচার মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা ‘মাদক ব্যবসার’ অভিযোগ তুলে ওই বাড়িতে ভাঙচুর চালান। বিষয়টি নিশ্চিত করেন কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি শিবিরুল ইসলাম।
বিডিনিউজ২৪-এর ইউটিউব চ্যানেলে গত ২৯ আগস্ট ‘ময়মনসিংহে ‘মাদক ব্যবসার’ অভিযোগে বাড়ি ভাঙচুর’ শিরোনামে প্রকাশিত ভিডিওর সঙ্গে ভাইরাল দৃশ্যের মিল রয়েছে। একই ঘটনা নিয়ে অন্যান্য গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ভাঙচুরের শিকার ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে ‘কালের কণ্ঠস্বর’-এ গত ৩০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ী নাজিরুলের বসতবাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ‘নাজিরুল’ নাম থেকেই স্পষ্ট—যার বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে, তিনি মুসলিম।
ভিডিও ও ছবির দৃশ্য, স্থানীয় প্রতিবেদন এবং পুলিশের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়—ঘটনাটি কুমিল্লার কোনো হিন্দু পরিবারের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা নয়। অনুসন্ধানে ছাগল ফসল খাওয়ায় শুভাশিস দাসের পরিবারের ওপর হামলা, ছুরিকাঘাত, হাত কাটা, স্ত্রীকে মারধর কিংবা ১২ বছর বয়সী মেয়ে নিখোঁজ থাকার দাবির সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইউনুস মোস্তাফিজুরের নেতৃত্বে হামলার দাবিও যাচাইযোগ্য কোনো সূত্রে প্রমাণিত হয়নি।
যাচাইয়ে ভাইরাল ছবি-ভিডিওর দৃশ্য, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, পুলিশের বক্তব্য এবং ভুক্তভোগীর পরিচয় তুলনা করা হয়েছে। ফলাফলে স্পষ্ট—ময়মনসিংহের মাদক ব্যবসার অভিযোগে ভাঙচুরের দৃশ্যকে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক রঙ দিয়ে ‘হিন্দু বাড়িতে মুসলিমদের হামলা-লুটপাট’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এ ধরনের অপপ্রচার সামাজিক বিভ্রান্তি, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
সুতরাং ‘ছাগল ফসল খাওয়ায় হিন্দু বাড়িতে মুসলিমরা হামলা চালিয়ে লুটপাট করেছে’—দাবিটি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।

